বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে ঢুকে পড়তেই শুধু শিরোপার লড়াই নয়, ব্যক্তিগত পুরস্কারের দৌড়ও জমে উঠেছে। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বলের আলোচনায় এখন সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে দুই দলের নাম, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। আর লিওনেল মেসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন ফ্রান্সের তিন তারকা।
কালশির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গোল্ডেন বল জয়ের দৌড়ে আপাতত সবচেয়ে এগিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে। লেখার সময় তার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে ৪৬ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে মেসি, তার সম্ভাবনা ৩৩ শতাংশ। এরপর আছেন ফ্রান্সের আরেক তারকা মাইকেল ওলিসে, তার সম্ভাবনা ৯ শতাংশ।
এই হিসাব অবশ্য ফিফার আনুষ্ঠানিক সংক্ষিপ্ত তালিকা নয়। এটি বেটিং সাইটের হিসাব, যা ম্যাচের ফল, খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স, দল কত দূর যাচ্ছে এবং ব্যবহারকারীদের লেনদেনের প্রতিক্রিয়ায় দ্রুত বদলাতে পারে। তবু নকআউট পর্বের শুরুতে গোল্ডেন বল দৌড়ের গতিপথ বোঝার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
এমবাপ্পে নিজের দাবিটা আরও শক্ত করেছেন সুইডেনের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে। ৩-০ ব্যবধানে ফ্রান্সের জয়ে জোড়া গোল করেন তিনি। এই দুই গোলে চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা হয়েছে ৬, যা তাকে মেসির সঙ্গে গোল্ডেন বুট দৌড়ে যৌথভাবে শীর্ষে তুলেছে।
শুধু গোলসংখ্যা নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নতুন উচ্চতায় উঠেছেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে তার মোট গোল এখন ১৮, মেসির ১৯ গোলের রেকর্ড থেকে মাত্র এক গোল দূরে। ফলে গোল্ডেন বলের আলোচনায় তার অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে শক্ত।
মেসি এখনো আর্জেন্টিনার প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২২ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জিতেছিলেন তিনি। তার আগে ২০১৪ বিশ্বকাপেও একই পুরস্কার পেয়েছিলেন। এবার ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনার খেলার কেন্দ্রে আছেন। গ্রুপ পর্বে গোল করেছেন, দলকে এগিয়ে নিয়েছেন এবং আবারও বড় মঞ্চে নিজের প্রভাব দেখিয়েছেন।
তবে মেসির সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, আর্জেন্টিনাকে নকআউটে আরও এগিয়ে নিতে হবে। গোল্ডেন বল সাধারণত শুধু ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দল কত দূর গেল, বড় ম্যাচে কে পার্থক্য গড়ল, নকআউটে কার প্রভাব বেশি ছিল, এসবও বড় ভূমিকা রাখে।
এই জায়গাতেই ফ্রান্সের সুবিধা বাড়ছে। দিদিয়ের দেশমের দল সুইডেনকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে দাপটের সঙ্গে। শুধু এমবাপ্পে নয়, ফ্রান্সের আক্রমণে একসঙ্গে জ্বলে উঠছেন ওলিসে, ওসমান দেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলা। এই বহুমাত্রিক আক্রমণই ফরাসিদের গোল্ডেন বল দৌড়ে শক্ত অবস্থানে এনে দিয়েছে।
মাইকেল ওলিসে এই বিশ্বকাপের বড় আবিষ্কারদের একজন। সুইডেনের বিপক্ষে বারকোলার গোলের পাস তার, এমবাপ্পের দ্বিতীয় গোলের পাসও তার। চলতি আসরে তার অ্যাসিস্ট সংখ্যা ৫। আক্রমণ সাজানো, জায়গা খুঁজে দেওয়া এবং শেষ পাসে তার প্রভাব ফ্রান্সকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
অন্যদিকে দেম্বেলে গ্রুপ পর্ব থেকেই ফ্রান্সের আক্রমণে বড় ভূমিকা রাখছেন। তার গতি, ড্রিবলিং ও সরাসরি আক্রমণ ফ্রান্সকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। গোল্ডেন বল দৌড়ে তার সম্ভাবনা এমবাপ্পে বা মেসির মতো উঁচু না হলেও, ফ্রান্স যদি আরও দূর যায়, তার অবস্থান দ্রুত বদলে যেতে পারে।
গোল্ডেন বলের ইতিহাস বলছে, শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি অনেক সময় টুর্নামেন্টের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ২০২২ সালে মেসি আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতাতে নেতৃত্ব দিয়ে পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালে লুকা মদরিচ ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তুলে সেরা হয়েছিলেন। অর্থাৎ শুধু গোল নয়, নেতৃত্ব, প্রভাব ও দলীয় অগ্রযাত্রাও এখানে বড় বিষয়।
এই মুহূর্তে তাই দৌড়টা দাঁড়িয়েছে এমন: এমবাপ্পে পরিসংখ্যান ও দলের শক্ত অবস্থানের কারণে এগিয়ে, মেসি আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তার পিছু নিচ্ছেন, আর ওলিসে ও দেম্বেলে ফ্রান্সের আক্রমণযন্ত্রে নিজেদের প্রভাব দিয়ে আলোচনা বাড়াচ্ছেন।
তবে নকআউট পর্বে এক ম্যাচেই সব বদলে যেতে পারে। মেসি যদি কেপ ভার্দের বিপক্ষে বড় পারফরম্যান্স করেন, তার সম্ভাবনা আবার বাড়বে। এমবাপ্পে যদি প্যারাগুয়ের বিপক্ষেও গোল করেন, তার অবস্থান আরও মজবুত হবে। ওলিস বা দেম্বেলের কেউ যদি বড় ম্যাচে নায়ক হন, তারাও হঠাৎ দৌড়ে উঠে আসতে পারেন।

