ডেইলি নিউজ মেইল

নতুন পোশাকে মাঠে নামল পুলিশ

নতুন পোশাকে মাঠে নামল পুলিশ

দীর্ঘ আলোচনা, বিতর্ক ও পরীক্ষামূলক পরিবর্তনের পর আবারও নতুন পোশাকে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ পুলিশ। গাঢ় নীল ও হালকা জলপাই রঙের শার্টের সঙ্গে খাকি রঙের ট্রাউজারে ফিরে এসেছে বাহিনীটি। নতুন এই পোশাককে অধিকাংশ পুলিশ সদস্য স্বস্তিদায়ক, মর্যাদাপূর্ণ এবং বাহিনীর ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।

বুধবার (১ জুলাই) থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের নতুন ইউনিফর্ম গায়ে দেখা গেছে।

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের নতুন ইউনিফর্মে দেখা যায়। একই দিন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) পরিচালিত পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নবনির্মিত ‘বরকাউ পুলিশ ক্যাম্প’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরকে গাঢ় নীল শার্ট এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদকে হালকা জলপাই রঙের শার্টে দেখা যায়। উভয়ের ট্রাউজার ছিল খাকি রঙের।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, বুধবার থেকেই নতুন ইউনিফর্ম ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে এখনো সব সদস্যের হাতে নতুন পোশাক পৌঁছায়নি। পর্যায়ক্রমে সবার কাছে ইউনিফর্ম সরবরাহ করা হবে। যারা ইতোমধ্যে পেয়েছেন, তারা নতুন পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করছেন।

কেন বদলানো হলো পোশাক?

গত ১৮ জুন পুলিশ সদর দপ্তর নতুন ইউনিফর্মের রং ও নকশা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পুলিশের শার্ট, ট্রাউজার, জার্সি, কার্ডিগান, পুলওভার, জ্যাকেট, নারী সদস্যদের পোশাক, মাথার আবরণসহ বিভিন্ন ইউনিফর্মে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এর আগে পুলিশের শার্ট ছিল লোহা-ধূসর এবং ট্রাউজার ছিল কফি-বাদামি ধূসর রঙের। এখন সেই জায়গায় এসেছে গাঢ় নীল, হালকা জলপাই ও খাকির সমন্বয়।

কোন ইউনিটে কেমন পোশাক?

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী জেলা পুলিশসহ অধিকাংশ ইউনিটের সদস্যরা গাঢ় নীল শার্ট ও খাকি ট্রাউজার পরবেন। অন্যদিকে মহানগর পুলিশের কর্মকর্তাদের জন্য হালকা জলপাই রঙের শার্ট নির্ধারণ করা হয়েছে।

এপিবিএন, এসপিবিএন, এসবি, সিআইডি ও র‍্যাবের জন্য পৃথক নির্দেশনা রাখা হয়েছে। শার্টে থাকবে চারটি পকেট এবং সামনের অংশে সাতটি বোতাম। গ্রীষ্মে অর্ধহাতা এবং শীতে পূর্ণহাতা শার্ট পরার বিধান রাখা হয়েছে।

নারী পুলিশের জন্যও নতুন নির্দেশনা

নতুন প্রজ্ঞাপনে নারী পুলিশ সদস্যদের পোশাকেও পরিবর্তন এসেছে। তারা চাইলে শাড়ি পরতে পারবেন। জেলা পুলিশের ক্ষেত্রে গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে গাঢ় নীল ব্লাউজ এবং মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে হালকা জলপাই রঙের ব্লাউজ পরার বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া নারী সদস্যরা অনুমোদিত গাঢ় নীল মাথার আবরণ ব্যবহার করতে পারবেন। ট্রাফিক ইউনিটে কর্মরত নারী সদস্যরা সারা বছর পূর্ণহাতা শার্ট বা ব্লাউজ পরতে পারবেন। গর্ভাবস্থায় ইউনিটপ্রধানের অনুমতি নিয়ে সাধারণ পোশাক পরার সুযোগও রাখা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে স্বস্তি

নতুন ইউনিফর্ম পরা একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, বর্তমান পোশাকটি বাহিনীর মর্যাদা ও পরিচয়ের সঙ্গে বেশি মানানসই। তাদের মতে, আগের লোহা-ধূসর রঙের ইউনিফর্ম নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ধরনের সমালোচনা ও বিদ্রূপের মুখে পড়তে হয়েছিল।

একজন কর্মকর্তা বলেন, গাঢ় নীল ও খাকি রঙ পুলিশের ঐতিহ্যবাহী পরিচিতিকে ফিরিয়ে এনেছে। এই পোশাকে দায়িত্ব পালন করতে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস দুটোই বেশি অনুভব করছি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। বাহিনীর কাঠামো, কার্যক্রম ও জনসম্পৃক্ততার পাশাপাশি ইউনিফর্ম পরিবর্তনের দাবিও সামনে আসে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নতুন ইউনিফর্মের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২৫ নভেম্বর লোহা-ধূসর রঙের পোশাক চালু করা হলেও সেটি মাঠপর্যায়ে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। শেষ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের মতামত, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং জনমতের ভিত্তিতে আবারও ইউনিফর্মে পরিবর্তন আনা হয়।

পোশাক পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক রূপের পরিবর্তন নয়; এটি একটি বাহিনীর পরিচয়, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থার প্রতীকও। নতুন ইউনিফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের ঐতিহ্যবাহী ভাবমূর্তির কাছাকাছি ফিরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন প্রত্যাশা—পোশাকের পরিবর্তনের পাশাপাশি সেবার মান, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও জনগণের আস্থা অর্জনেও সমান গুরুত্ব দেবে পুলিশ বাহিনী।