সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদে রেলস্টেশন ধসে ১৬ জন মারা যাওয়ার ঘটনার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে রোববার হাজার হাজার মানুষ সমবেত হওয়ার কথা রয়েছে।
ওই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দেশটিতে সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়, যা শেষ পর্যন্ত এক সপ্তাহ আগে ডানপন্থী ক্ষমতাসীন দলের পতন ঘটাতে ভূমিকা রাখে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
দুই বছর আগে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের সংস্কার করা রেলস্টেশনের কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন মারা যান। এদের মধ্যে ছয় বছর ও ১০ বছর বয়সী দুই বোনও ছিল।
দুর্ঘটনার পর দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সঙ্গে কয়েক মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এর জেরে দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০০০ সালে সাবেক স্বৈরশাসক স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতনের পর সার্বিয়ায় এটিই ছিল অন্যতম বৃহৎ গণবিক্ষোভ।
দুর্ঘটনায় ২৭ বছর বয়সী ছেলে স্তেফানকে হারানো দিয়ানা হ্রকা এএফপিকে বলেন, ‘যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল, সেখানে ফিরে যাওয়া খুবই কষ্টের।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবার সেখানে ফিরে যাওয়া আগের চেয়েও কঠিন হয়ে ওঠে।’
এবারের বার্ষিকী এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন আগাম নির্বাচনের ফল ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহ পেরিয়েছে।
নির্বাচনে বিজয়ী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আবারও সেই স্থানে ফিরছেন, যেখান থেকে তাদের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।
দুর্ঘটনায় ছেলেকে হারানোর পর দিয়ানা হ্রকা নিজেই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তিনি বলেন, ন্যায়বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলন তাকে আশার আলো দেখিয়েছে।
গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হ্রকা বলেন, ‘মানুষের সমর্থন আমার কাছে অনেক বড় বিষয় ছিল।’
তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আরও বলেন, ‘যারা আমাকে সমর্থন করেছেন, যারা আন্তরিকভাবে চান আমরা সবাই একসঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করি, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
তবে ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কাউকে দায়ী করে শাস্তির আওতায় আনা হয়নি।
দুর্ঘটনার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবিতে সার্বিয়াজুড়ে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। এই আন্দোলনই গত রোববারের নির্বাচনে ছাত্র আন্দোলন-সমর্থিত জোটের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২৫০ আসনের পার্লামেন্টে ছাত্র-সমর্থিত তালিকাটি প্রায় ১৪০টি আসনে জয় পেয়েছে। ফলে এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তারা।
দিয়ানা হ্রকা আশা করছেন, দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বড় পরিবর্তনের ফলে রেলস্টেশন দুর্ঘটনার তদন্ত আরও গতিশীল হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। এই মুহূর্তে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র প্রেরণা হলো— একদিন ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, এই বিশ্বাস।’
নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে আলেকজান্ডার ভুচিচের দল ক্ষমতা ছাড়ার কথা স্বীকার করার পর থেকেই ছাত্র আন্দোলনের নেতারা দুর্নীতি ও আলোচিত হত্যাকাণ্ডের একাধিক তদন্তে অগ্রগতি দাবি করে আসছেন।
একই সঙ্গে বিদায়ী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও নতুন করে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
পাশাপাশি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছে ছাত্র আন্দোলন।
নোভি সাদের রেলস্টেশন দুর্ঘটনা নিয়ে একাধিক তদন্ত চললেও এখনো কোনো মামলার বিচার শুরু হয়নি।
দুর্ঘটনার কয়েক দিন পর পদত্যাগ করা সাবেক নির্মাণমন্ত্রী গোরান ভেসিচের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালে আরও ১২ জনের সঙ্গে জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টির অভিযোগে মামলা করা হয়।
এ ছাড়া প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে পৃথক একটি দুর্নীতির তদন্তেও সন্দেহভাজন হিসেবে রয়েছেন ভেসিচ। ওই তদন্তে আরেক সাবেক মন্ত্রী তোমিস্লাভ মোমিরোভিচসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।
রেলস্টেশন সংস্কারকাজে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থের সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগও আলাদাভাবে তদন্ত করছে ইউরোপীয় পাবলিক প্রসিকিউটরস অফিস।
দিয়ানা হ্রকা বলেন, ‘এখন যদি আমরা দায়ীদের কারাগারে পাঠাতে পারি, তাহলে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটবে না।’
ছেলেকে হারানো এই মা আরও বলেন, ‘আমি আশা করি, কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে রাজপথে নামতে হওয়ার ঘটনা এটাই শেষবার। আমার একমাত্র চাওয়া এটুকুই।’

